প্রচ্ছদ    HT All Article   ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা: গলদ কোথায়

ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থা: গলদ কোথায়

২৩ জানুয়ারি ২০১৬ ০২:৪৭ পিএম
বজ্রশক্তি ডেস্ক
রাকীব আল হাসান

মানুষ আর দশটা প্রাণীর মতো নয়। সে দেহ এবং আত্মার সমন্বয়ে উন্নত বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন অসাধারণ একটি সৃষ্টি। সে একাধারে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টি (খাইরুল বারিইয়া, শাররুল বারিইয়া- সুরা বায়্যিনাহ-৬,৭)। তার এই শ্রেষ্ঠত্ব বা নিকৃষ্টতা, হীনতা নিরূপিত হয় তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কর্মের দ্বারা, আর এই চরিত্র নির্মাণ করে তার শিক্ষা। ‘প্রাণী’ মানুষকে আশরাফুল মখলুকাতে রূপান্তরিত করাই হচ্ছে শিক্ষার উদ্দেশ্য। যে শিক্ষা মানুষকে চরিত্রে, চিন্তায়, কর্মে উন্নত করে সেটাই প্রকৃত শিক্ষা, আর যে শিক্ষা মানুষকে চরিত্রে, চিন্তায় কর্মে অধঃগামী করে সেটা কুশিক্ষা। সকল সত্য ও ন্যায়ের উৎস মহান আল্লাহ। তিনিই মানুষের এবং সকল দৃশ্যমান ও অদৃশ্যের স্রষ্টা। সুতরাং মানুষের প্রথম শিক্ষাই হওয়া উচিৎ স্রষ্টা সম্পর্কে জ্ঞান লাভ করা, সকল জ্ঞানের উৎস হচ্ছেন স্রষ্টা। সেই মহান সত্ত্বাকে বাদ দিয়ে কোন জ্ঞান হতে পারে না। আবার সৃষ্টির মধ্য দিয়েই স্রষ্টার পরিচয়, তাই অণু-পরমাণু থেকে শুরু করে এই মহাবিশ্ব এবং এর মধ্যস্থিত যাবতীয় বস্তুনিচয় অর্থাৎ সৃষ্টি সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করাও শিক্ষার মৌলিক অংশ। এই জ্ঞানকেই বলা যায় বিজ্ঞান। তৃতীয়ত, যেহেতু মানুষ সামাজিক জীব; তাই তাকে জ্ঞান লাভ করতে হবে মানবজাতির শান্তিতে বসবাসের জন্য যে জীবনব্যবস্থা আল্লাহ তাঁর নবী-রসুলদের মাধ্যমে পাঠিয়েছেন, সেই জীবনব্যবস্থা সম্পর্কে। এক কথায় বলতে গেলে, একজন শিক্ষিত মানুষকে সবার আগে জানতে হবে, স্রষ্টার সাথে তার কী সম্পর্ক এবং তারপর জানতে হবে মানবজাতির সঙ্গে তার কী সম্পর্ক। এরপর জানতে হবে সৃষ্টির অন্যান্য বস্তুনিচয়ের সঙ্গে তার কী সম্পর্ক। এই তিনটি বিষয়ে একজন ব্যক্তির যদি সঠিক ধারণা না থাকে তবে তাকে শিক্ষিত বলা যাবে না। কিন্তু আমাদের দেশে যে শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে তা থেকে কি মানুষ প্রকৃতপক্ষে সুশিক্ষিত, সচ্চরিত্রবান, দেশপ্রেমিক ও ধার্মিক হতে পারছে? শিক্ষার মূল উদ্দেশ্যই হবে মানবতার কল্যাণ। সেটা কি এই প্রচলিত শিক্ষা থেকে অর্জিত হচ্ছে।
আমাদের দেশে প্রধানত দু’টি ধারার শিক্ষাব্যবস্থা চালু আছে। সাধারণ শিক্ষা ও মাদ্রাসা শিক্ষা। প্রচলিত এই শিক্ষাব্যবস্থারটি চালু হয় মূলত ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক যুগ থেকে। এরপর সময়ের পরিক্রমায় শিক্ষাব্যবস্থায় সামান্য কিছু পরিবর্তন করা হলেও মূল কাঠামো, লক্ষ্য একই রয়ে গেছে। এ প্রসঙ্গে সংক্ষেপে বলছি।
দীর্ঘ দু’শো বছর ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শক্তিটি দাপটের সাথে পৃথিবীর বিরাট একটি অঞ্চল শাসন করে, যার মধ্যে আমাদের এই উপমহাদেশ অন্যতম। তারা এই উপমহাদেশ ছেড়ে চলে যাবার পরেও যেন এখানে তাদের স্বার্থ কায়েম থাকে সেজন্য একটি শয়তানি ফন্দি করল। প্রথমত তারা ঐ সময়ের সকল শিক্ষাব্যবস্থা বন্ধ করে দিল এবং দুইটি ধারায় শিক্ষাব্যবস্থা চালু করল। এর একটি অংশ ধর্মীয় শিক্ষা বা মাদ্রাসা শিক্ষা এবং অন্যটি সাধারণ শিক্ষা। উপমহাদেশের বড়লাট লর্ড ওয়ারেন হেসটিংস ১৭৮০ সনে ভারতের তদানীন্তন রাজধানী কলকাতায় আলীয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করল। এই মাদ্রাসায় ইসলাম শিক্ষা দেওয়ার জন্য খ্রিষ্টান পণ্ডিতরা বহু গবেষণা করে একটি নতুন ইসলাম দাঁড় করালেন যে ইসলামের বাহ্যিক রূপ বা দৃশ্য প্রকৃত ইসলামের মতো মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সেটার আকিদা এবং চলার পথ এবং চরিত্র আল্লাহর রসুলের ইসলামের ঠিক বিপরীত। সেখানে ইসলামের অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যেমন মূল ভিত্তি তওহীদ তথা আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, ঐক্য, শৃঙ্খলা, আনুগত্য, মিথ্যার সাথে আপস না করা, অন্যায়ের প্রতিবাদ, স্বার্থহীনভাবে সমাজ ও মানুষের কল্যাণে কাজ করা, সমাজে ন্যায় ও শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য সর্বাত্মক প্রচেষ্টা করা, মানবতা, মনুষ্যত্ব, দেশপ্রেম ইত্যাদি বিষয়ের কোনো গুরুত্ব এখানে রাখা হলো না। এখানে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে শেখানো হলো খুঁটি-নাটি মাসলা-মাসায়েল আর ব্যক্তিগত আমল করে জান্নাতে যাওয়ার পদ্ধতি (যদিও মানুষকে অশান্তিতে রেখে হাজার ব্যক্তিগত আমল করেও জান্নাতে যাওয়া যাবে না)। ধর্মের প্রকৃত উদ্দেশ্য যে মানুষের কল্যাণ সেটা ভুলিয়েই দেওয়া হলো। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর চেয়ে ছোটখাটো নফল, মুস্তাহাব আমলের গুরুত্বই অধিক ফুটিয়ে তোলা হলো, সমস্ত পৃথিবীময় সত্যদীন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মানবজাতির মধ্যকার যাবতীয় অন্যায়, অশান্তি দূর না করলে যে মো’মেন হওয়া যাবে না এই শিক্ষা দেওয়া হলো না। এক কথায় দেশের মঙ্গলের জন্য, সমাজের শান্তির জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য কাজ করা যে আল্লাহর সন্তুষ্টির অন্যতম উপায়, জান্নাতে যাবার জন্য সর্বোত্তম এবাদত এটা তাদের জ্ঞানে নেই।
এই শিক্ষাব্যবস্থার সিলেবাসে অঙ্ক, ভূগোল, বিজ্ঞান, অর্থনীতি, প্রযুক্তি ও কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদির কোনো কিছুই রাখা হলো না, যেন মাদ্রাসা থেকে বের হয়ে এসে আলেমদের রুজি-রোজগার করে খেয়ে বেঁচে থাকার জন্য এই দীন, ধর্ম বিক্রি করে রোজগার করা ছাড়া আর কোনো পথ না থাকে। ব্রিটিশরা এটা এই উদ্দেশ্যে করল যে তাদের মাদ্রাসায় শিক্ষিত এই মানুষগুলো যাতে বাধ্য হয় দীন বিক্রি করে উপার্জন করতে এবং তাদের ওয়াজ নসিহতের মাধ্যমে বিকৃত ইসলামটা এই জনগোষ্ঠির মন-মগজে স্থায়িভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। ব্রিটিশরা তাদের এই পরিকল্পনায় শতভাগ সাফল্য লাভ করল। এই মাদ্রাসা প্রকল্পের মাধ্যমে দীনব্যবসা বা ধর্মব্যবসা ব্যাপক বিস্তার লাভ করল এবং এর মাধ্যমে মুসলিমদের মধ্যেও অন্যান্য ধর্মের মতো একটি স্বতন্ত্র পুরোহিত শ্রেণি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করল। তারা দীনের বহু বিতর্কিত বিষয় নিয়ে তর্ক-বাহাশ এবং ফলশ্র“তিতে বিভেদ-অনৈক্যের সৃষ্টি করতে থাকলো, যার দরুন জাতি খ্রিষ্টান প্রভুদের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার শক্তি হারিয়ে ফেলল। এই পুরোহিত শ্রেণির কর্মকাণ্ডের ফলে তাদেরকে অনুসরণকারী বৃহত্তর দরিদ্র জনগোষ্ঠির চরিত্র প্রকৃতপক্ষেই পরাধীন দাস জাতির চরিত্রে পরিণত হলো, কোনোদিন তাদের প্রভুদের বিরুদ্ধে মাথা তুলে দাঁড়াবার চিন্তা করারও শক্তি রইল না। ফলে তারা চিরতরে নৈতিক মেরুদণ্ড হারিয়ে ফেলে সমাজের উচ্চ শ্রেণির মুখাপেক্ষি হয়ে রইল।
এভাবেই খ্রিষ্টান পণ্ডিতরা নিজেরা অধ্যক্ষ থেকে ১৯২৭ সন পর্যন্ত ১৪৬ বছর ধরে এই মুসলিম জাতিকে এই বিকৃত ইসলাম শেখালো। অতঃপর তারা যখন নিশ্চিত হলো যে, তাদের তৈরি করা বিকৃত ইসলামটা তারা এ জাতির হাড়-মজ্জায় ঢুকিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে এবং আর তারা কখনও এটা থেকে বের হতে পারবে না তখন তারা ১৯২৭ সনে তাদের আলীয়া মাদ্রাসা থেকেই শিক্ষিত মওলানা শামসুল ওলামা কামাল উদ্দিন আহমেদ (এম.এ.আই.আই.এস) এর কাছে অধ্যক্ষ পদটি ছেড়ে দিলো, এর আগে পর্যন্ত মোট ৪৬ জন খ্রিষ্টান পণ্ডিত এই মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল পদে আসীন ছিল। (আলীয়া মাদ্রাসার ইতিহাস, মূল- আ. সাত্তার, অনুবাদ- মোস্তফা হারুণ, ইসলামী ফাউণ্ডেশন, বাংলাদেশ,  Reports on Islamic Education and Madrasah Education in Bengal” by Dr. Sekander Ali Ibrahimy (Islami Faundation Bangladesh), মাদ্রাসা-ই-আলিয়ার ইতিহাস, মাওলানা মমতাজ উদ্দীন আহমদ, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ)।
অপরদিকে সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত অংশটিতে এই বিরাট এলাকা শাসন করতে যে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের কেরাণীর কাজ করার জনশক্তি প্রয়োজন সেই উপযুক্ত জনশক্তি তৈরি করার বন্দোবস্ত করা হলো। তারা এতে ইংরেজি ভাষা, সুদভিত্তিক অঙ্ক, বিজ্ঞানের বিভিন্ন দিক, প্রযুক্তিবিদ্যা অর্থাৎ পার্থিব জীবনে যা যা প্রয়োজন হয় তা শেখানোর বন্দোবস্ত রাখলো। এখানে আল্লাহ, রসুল, আখেরাত ও দীন সম্বন্ধে প্রায় কিছুই রাখা হলো না। এখানেও জাতীয় ঐক্য, শৃঙ্খলা, আনুগত্য, দেশপ্রেম, ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা তথা মানুষের কল্যাণের দিক ইত্যাদি নীতি-নৈতিকতা অর্থাৎ এক কথায় ধর্মের শিক্ষার কিছুই রাখা হলো না। ইসলামের গৌরবময় ইতিহাসের পরিবর্তে ইউরোপ-আমেরিকার রাজা-রানীদের ইতিহাস, তাদের শ্রেষ্ঠত্বের কাহিনীই শিক্ষা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হলো। ফলে এই সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত শ্রেণিটি মনে-প্রাণে প্রভুদের সম্বন্ধে একধরনের ভক্তি ও নিজেদের অতীত সম্বন্ধে হীনম্মন্যতায় ভুগতে লাগলো। বাস্তবতা এমন দাঁড়ালো যে তারা নিজেদের প্রপিতামহের নাম বলতে না পারলেও ইউরোপীয় শাসক, কবি, সাহিত্যিকদের তস্য-তস্য পিতাদের নামও মুখস্থ করে ফেলল। নিজেদের সোনালি অতীত ভুলে যাওয়ায় তাদের অস্থিমজ্জায় এটা প্রবেশ করল যে সর্বদিক দিয়ে প্রভুরাই শ্রেষ্ঠ। এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে যারা যত শিক্ষিত হয়ে বের হতে লাগল তারা তত নীতি-নৈতিকতা বিবর্জিত, স্বার্থবাদী, ভোগ-বিলাসী চরিত্রের হতে লাগল। এরাই সমাজের বড় বড় আসনে বসে দেশের সম্পদ আত্মসাৎ করতে লাগল আর বিদেশের ব্যাংকে অর্থ পাচার, বিদেশে বাড়ি-গাড়ি করা, সন্তানকে লেখা-পড়া করানোর জন্য সেখানেই পারিবারিক সেটলমেন্ট ইত্যাদি করে দেশের ক্ষতি সাধন করতে লাগল।
সবচাইতে ভয়ঙ্কর ও বিপজ্জনক যে দিকটি তা হচ্ছে এই ইউরোপীয় ধর্মবর্জিত ভোগবাদী, বস্তুবাদী (Materialistic) যে জীবনব্যবস্থা এই জাতির উপর চাপিয়ে দিল সেই জীবনব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার জন্য সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করল, সেই শিক্ষার উদ্দেশ্যই হলো স্বার্থ, ব্যক্তি স্বার্থ। যেখানে আল্লাহর দেওয়া জীবনব্যবস্থার উদ্দেশ্যই হলো পৃথিবীর মানুষের কল্যাণ, শান্তি। এই ব্যবস্থায় যিনি শিক্ষিত হবেন তার শিক্ষার উদ্দেশ্যই হবে নিঃস্বার্থভাবে অন্য মানুষের কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করা। আর ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষার উদ্দেশ্যই হলো স্বার্থপরতা। নিজের উন্নতি, সমৃদ্ধি, সুখ, উপভোগ, বিলাস ইত্যাদিই হলো উদ্দেশ্য। অন্য মানুষ সুখে আছে না দুঃখে আছে এটা তাদের ভাবার বিষয় নয়। অর্থাৎ জীবনের উদ্দেশ্যই ঘুরিয়ে দিল।
এখন যদি আমরা একটি উন্নত জাতি গঠন করতে চাই, যদি দুর্নীতিমুক্ত শান্তিপূর্ণ নিরাপদ সমাজ চাই তবে প্রথমেই লাগবে সুশিক্ষিত চরিত্রবান দেশপ্রেমিক ও মানবপ্রেমী নিঃস্বার্থ কিছু মানুষ। এর জন্য শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক কিছু পরিবর্তন অপরিহার্য। শিক্ষাব্যবস্থা ছাড়াও আপামর জনতাকে কিছু মৌলিক ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় শিক্ষা প্রদানের জন্য পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

জনগণকে কী কী বিষয়ে শিক্ষা দিতে হবে

আমাদের সমাজে যে ধর্ম প্রচলিত আছে তা একান্তই উপাসনাকেন্দ্রিক- সমাজকেন্দ্রিক নয়। এর নৈতিক শিক্ষাগুলি বহুবিধ কারণে মানুষকে অপরাধ থেকে দূরে রাখতে পারছে না। তাদের জন্য প্রয়োজন ধর্মের প্রকৃত শিক্ষা। মানুষকে শিক্ষা দিতে হবে প্রকৃত ধর্ম কী, প্রকৃত ইবাদত কী, মানুষের কাছে স্রষ্টার চাওয়া কী, কাজ ও কাজের পরিণতি (হাশর) কী, মানবজন্মের সার্থকতা কিসে, দেশপ্রেম কী, আমাদের সামাজিক কর্তব্য কী, জান্নাতে বা স্বর্গে যাবে কারা ইত্যাদি। অতি সংক্ষেপে মূল কথাগুলো বলার চেষ্টা করছি:-
(১) ধর্ম কী? প্রকৃতপক্ষে ধর্ম হলো কোনো পদার্থ বা প্রাণীর প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্য। যেমন চুম্বকের ধর্ম আকর্ষণ করা, আগুনের ধর্ম পোড়ানো, পানির ধর্ম ভেজানো। ঠিক একইভাবে মানুষের ধর্ম হলো মানুষের অভ্যন্তরস্থ মানবীয় গুণাবলী। সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতি, দয়া, মায়া, ভালোবাসা, মনুষ্যত্ব, মানবতা, সৌহার্দ্য, বিবেক, সহমর্মিতা, শৃঙ্খলা ইত্যাদি মানবীয় গুণাবলীই হলো মানুষের ধর্ম। যতক্ষণ একজন মানুষ অন্যের ব্যথায় ব্যথিত হয়, অন্যের দুঃখে দুঃখী হয়, অন্যের আনন্দে আনন্দিত হয়, অপরকে সহযোগিতা করে, আর্তপীড়িতের পাশে দাঁড়ায় ততক্ষণ সে ব্যক্তি ধার্মিক হিসেবে পরিগণিত হবার যোগ্য, কেননা তার ভিতরে মনুষ্যত্বের বৈশিষ্ট্যগুলি আছে। পক্ষান্তরে কেউ যদি নামাজ, রোজা, হজ্ব, পূজা, অর্চনা, উপাসনা ইত্যাদি নিয়ে দিনরাত ব্যাপৃত থাকে কিন্তু তার ভিতরে মানবতার গুণাবলী না থাকে সে প্রকৃত ধার্মিক নয়, আল্লাহর প্রকৃত উপাসক নয়।
(২) প্রকৃত ইবাদত ও মানবজীবনের সার্থকতা: মানবজাতির শান্তি ও নিরাপত্তা বিধানের জন্য কাজ করাই মানুষের প্রকৃত ইবাদত। যখন কারো বাড়িতে আগুন লাগে তখন যারা সেই আগুন নেভাতে না গিয়ে মসজিদে নামাজ পড়ে তারা আসলে আল্লাহর ইবাদত করছে না। আমাদের এ কথা থেকে কেউ যেন মনে না করেন যে, আমরা নামাজ পড়াকে ছোট করে দেখছি। হ্যাঁ, মানুষ অবশ্যই নামাজ পড়বে, কারণ নামাজ তাকে মানবতার কল্যাণে আত্মনিয়োগ ও সংগ্রাম করার যে চরিত্র দরকার তা সৃষ্টি করবে। মানুষের জীবনের উদ্দেশ্যে কেবল উদরপূর্তি, সংসারবৃদ্ধি ও দেহত্যাগ করা নয়, ওটা পশুর জীবন। মানুষ আল্লাহর রূহ ধারণকারী, আল্লাহর নিজ হাতে সৃষ্ট আশরাফুল মাখলুকাত। আল্লাহ তাঁর জীবনের উদ্দেশ্য স্থির করে দিয়েছেন যে, মানুষ যদি তার সমগ্র জীবনকালে স্বার্থকে কোরবানি দিয়ে মানবতার কল্যাণে নিজেকে উৎসর্গ করতে পারে তবেই তার মানবজনম সার্থক হবে। মানুষ যদি এই প্রত্যয় করে যে, সে বাঁচবে মানবতার কল্যাণে, মরবে মানবতার কল্যাণে, জ্ঞান লাভ করবে মানুষকে দেওয়া জন্য, জগতের উন্নতির জন্য, দুটো পয়সা রোজগারের জন্য নয় তবেই এই পৃথিবীতে তার আসার উদ্দেশ্য সার্থক হল।
(৩) মানুষের কাছে স্রষ্টার চাওয়া কী: স্রষ্টা আল্লাহর সবচেয়ে প্রিয় সৃষ্টি হলো মানুষ। স্রষ্টা চান তাঁর এই প্রিয় সৃষ্টি মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়ে শান্তিতে বসবাস করুক। মানুষকে অশান্তিতে রেখে যত ইবাদত-বন্দেগিই করা হোক না কেন স্রষ্টা তা গ্রহণ করবেন না। স্রষ্টা উপাসনালয়ে থাকেন না। স্রষ্টা আর্ত-পীড়িত, নির্যাতিত মানুষের ক্রন্দন শুনে ব্যথিত হন। অথচ, ধর্মব্যবসায়ীরা এই নির্যাতিত মানুষের দায়িত্ব শয়তান, অত্যাচারী দুর্বৃত্তদের হাতে ছেড়ে দিয়ে মসজিদ, মন্দির, গির্জা, প্যাগোডায় ঢুকেছেন। তারা অর্থ উপার্জনের জন্য ধর্মকে উপাসনা, পূজা প্রার্থনার বস্তুতে পরিণত করেছেন, ধর্মগুলিকে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা আর প্যাগোডার চার দেওয়ালের মধ্যে বন্দী করে রেখেছেন। স্রষ্টা এগুলি চান না।
(৪) দেশপ্রেম: যারা দেশের মানুষের জন্য, দেশের মানুষের মুক্তির জন্য, কল্যাণের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করে, এবং নিজেদের সমস্ত অর্জন, সমস্ত আয়, সমস্ত পরিশ্রম সমস্ত কিছু এদেশের মাটির জন্য, মানুষের জন্য বিলিয়ে দেয় তারাই হলো দেশপ্রেমিক। এখন এই দেশপ্রেম ও দেশপ্রেমিক একটা দেশের জন্য কতটুকু প্রয়োজন? দেশ যদি না থাকে তাহলে কোন দল, সমাজ, পরিবার কিছুই থাকবে না। আজ থেকে ৪৪ বছর আগে আমরা স্বাধীনতা পেয়েছি। পেয়েছি বাংলাদেশ। এখন আমাদের এই বাংলাদেশের সম্মান, মর্যাদা, প্রকৃত সার্বভৌমত্বের জন্য এর ষোল কোটি মানুষের মাঝে দেশপ্রেমের প্রয়োজনীয়তা তীব্রভাবে দেখা দিয়েছে। সবাই যদি এর প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করতে পারে তাহলে আর কেউ দেশের জন্য ক্ষতিকর কোনো কর্মকাণ্ডকে মেনে নেবে না এবং স্বার্থচিন্তার ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও দশের কল্যাণে নিজেদেরকে নিয়োজিত করবে। দেশপ্রেমের প্রকৃত অর্থ হলো দেশ ও দেশের মানুষের সুরক্ষা, ন্যায়-নীতি, কল্যাণ, নিরাপত্তা, সুবিচার প্রতিষ্ঠা করার জন্য আত্মনিয়োগ করা। এর জন্য প্রয়োজন সর্বত্র সত্যের বিস্তার ও প্রতিষ্ঠা করা। যে ভূখণ্ডে আল্লাহ আমাকে নিজের ঈমান, বিশ্বাস ধারণ করে নিরাপত্তার সঙ্গে বাস করার সুযোগ সৃষ্টি করে দিয়েছেন সেটাই আমার ভূখণ্ড। একে রক্ষা করা আমার ঈমানী কর্তব্য। ঐ ভূখণ্ডকে অন্যায়, অবিচার ও মিথ্যার কলুষমুক্ত করার জন্য যে প্রেরণা সেটাই দেশপ্রেম। আমরা এদেশে জন্মেছি, বড় হয়েছি, এদেশের প্রকৃতি আমাদের লালন করেছে, আমাদের পূর্ব পুরুষদের অস্তিত্বও এদেশে মিশে আছে। কাজেই এই দেশের জন্য, এখানে সত্যকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য, মানবতাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্য আমাদের সবাইকে, ধর্ম-দল-মত নির্বিশেষে সর্বশ্রেণির মানুষকে একত্রে কাজ করতে হবে। দেশের ক্ষতি হয়, মানুষের ক্ষতি হয় এমন কাজ যেন কেউ করতে না পারে এজন্য সকলকে সত্য দিয়ে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। যারা দেশপ্রেমিক সেজে, জনসেবার নাম করে দেশের ক্ষতি করে, দেশে অরাজকতা সৃষ্টি করে তাদেরকে প্রথমে আমাদের বুঝাতে হবে, যদি তারা সংশোধিত না হয় তবে তাদেরকে সম্মিলিতভাবে প্রতিহত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এ কাজগুলোই আমাদের এবাদত ও সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম।
(৫) ধর্মীয় দায়িত্ব ও সামাজিক কর্তব্য: কাজেই আসুন আমরা এ দেশের জন্য, সমাজের জন্য, মানুষের কল্যাণের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করি। এটা একদিকে আমাদের ঈমানী দায়িত্ব, ধর্মীয় দায়িত্ব আর অন্যদিকে সামাজিক কর্তব্য। ধর্মীয় দায়িত্ব এজন্য যে, অন্যের দুঃখ-দুর্দশা দূর করাই প্রকৃত এবাদত। আর এই এবাদত না করে কেউ জান্নাতে যেতে পারবে না। এটি আমাদের সামাজিক কর্তব্য এই জন্য যে, আমার সমাজ যদি ধ্বংস হয়ে যায় আমিও ধ্বংস হয়ে যাব। কাজেই সমাজের একজন সদস্য হিসাবে সমাজকে নিরাপদ করা আমার সামাজিক কর্তব্য। এ কর্তব্য পালন না করলে আমিও নিরাপদ থাকব না।
(৬) হাশর: মানুষের জীবন কর্মফলের চক্রে বাঁধা। মানুষ যে কাজই করে তার ফল অবশ্যই তাকে ভোগ করতে হবে। এখানে যদি সে খারাপ কাজ, মন্দ কাজ, মানুষের জন্য অকল্যাণকর কাজ করে তবে পৃথিবীতেই তাকে তার কুফল ভোগ করতে হবে, হাশরের দিনও তার কষ্টদায়ক ফল ভোগ করতেই হবে। মানুষের পরিণতি বা হাশরের উপমা আল্লাহ, ঈশ্বর প্রকৃতিতে ছড়িয়ে রেখেছেন যেমন- বীজ থেকে অঙ্কুরিত হয় গাছ আর গাছ থেকে হয় ফল। ফলই হচ্ছে সেই বীজের হাশর। এখন সেই বীজ যত ছোটই হোক বা যত বড়ই হোক, তিল, সরিষা, গম, সিম, সুপারি বা নারকেল যা-ই হোক না কেন। মানুষের কর্মও এমন বীজের মতই- তার একটি ফল আছেই। এটাই তার হাশর।
মানুষের আত্মিক এবং মানসিক পরিশুদ্ধির এই প্রশিক্ষণ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাগুলির মধ্যেও নেই, ধর্মগুলির মধ্যেও অনুপস্থিত, শিক্ষাব্যবস্থা সংস্কৃতি সবই তো সম্পূর্ণ বস্তুবাদী ও ভোগবাদী হয়ে গেছে। এ বিষয়গুলো যদি মানুষকে শিক্ষা দেয়া যায়, তাহলেই মানুষের মানসিক অবস্থার শুভ পরিবর্তন হবে এবং সামাজিক অপরাধ অনেকাংশেই বন্ধ হবে। এছাড়াও কিছু বিষয় সম্পর্কে আপামর জনতাকে সচেতন করে তুলতে হবে। সে বিষয়গুলি হলো-

আরও পড়ুন

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ, ধর্মব্যবসা, অপরাজনীতি

জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ: যখন কোনো মতবাদের দ্বারা উদ্বুদ্ধ হয়ে সন্ত্রাস ঘটনো হয় তখন তাকে সন্ত্রাসবাদ বলা হয়। জঙ্গিবাদও এক ধরণের সন্ত্রাসবাদ যা সৃষ্টি হয় বিকৃত ধর্মবিশ্বাস থেকে। সাধারণ সন্ত্রাসকে শুধু শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে দমন করা সম্ভব হলেও সন্ত্রাসবাদকে কেবল শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে নির্মূল করা সম্ভব নয়। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো আমাদের দেশেও জঙ্গিবাদকে মোকাবেলার জন্য শক্তি প্রয়োগের পন্থা অবলম্বন করা হয়েছে, কিন্তু এ পন্থা ভুল। আমরা বলি না যে শক্তি প্রয়োগের দরকার নেই, প্রয়োজন হলে অবশ্যই শক্তি প্রয়োগ করতে হবে, কিন্তু কর্তৃপক্ষকে বুঝতে হবে যে জঙ্গিরা একটি বিকৃত আদর্শে দীক্ষিত। এক শ্রেণীর ধর্মব্যবসায়ী নিজেদের রাজনীতিক ও পার্থিব স্বার্থ উদ্ধারের উদ্দেশ্যে তাদেরকে শেখাচ্ছে যে এটা জেহাদ, এই কাজে নিহত হলে তুমি শহীদ হবে। তাই দেখা যাচ্ছে- শক্তি প্রয়োগ করে একজনকে নির্মূল করতে গেলে আরও দশজন সৃষ্টি হয়ে যাচ্ছে, তারা আরও সতর্ক, নিত্য নতুন কৌশল অবলম্বন করছে, কোন কিছুতেই তাদের উত্থান ঠেকানো যাচ্ছে না। একারণে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদকে মোকাবেলা করার জন্য প্রয়োজন একটি সঠিক ধর্মীয় আদর্শ দিয়ে ভ্রান্ত মতবাদকে মানুষের মন থেকে বিতাড়িত করা।
ধর্মব্যবসা: ধর্ম এসেছে মানুষের কল্যাণের জন্য। ধর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা। সমাজ থেকে সকল প্রকার অন্যায়, অবিচার, শোষণ-বঞ্চনা দূর করে সার্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করাই হলো একজন ধার্মিক লোকের প্রধান কাজ। কিন্তু বর্তমানে ধর্ম হয়ে গেছে একশ্রেণির স্বার্থবাদী মানুষের স্বার্থ উদ্ধারের প্রধান হাতিয়ার। আমাদের সমাজে বহু পন্থায় ধর্মকে পুঁজি করে স্বার্থ হাসিল করা হয়। নামাজ পড়িয়ে, কোর’আন খতম দিয়ে, মিলাদ পড়িয়ে, জানাজা পড়িয়ে, খোতবা-ওয়াজ করে, পরকালে মুক্তিদানের জন্য জান্নাতের ওসিলা সেজে কথিত আলেম, মোল্লা-মাওলানারা অর্থ উপার্জন করে। আবার অনেকে ধর্মকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, মানুষের ধর্মীয় অনুভূতিকে কাজে লাগিয়ে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের মোকাবেলা করে। এগুলোই ধর্মব্যবসা। ধর্মের কাজের কোনো পার্থিব বিনিময় হয় না, এর বিনিময় বা পুরস্কার কেবল আল্লাহর কাছেই রয়েছে। কিন্তু যখনই তার মূল্য নির্ধারণ করা হয় বা স্বার্থের লোভে ধর্মের আশ্রয় গ্রহণ করা হয় তখন আর সেটা ধর্ম থাকে না, সেটা হয়ে যায় ধর্মব্যবসা যা সকল ধর্মে নিষিদ্ধ।
এখন যদি ধর্মব্যবসা ও ধর্মব্যবসায়ীদের প্রকৃত রূপ এবং তাদের প্রচারিত ধর্ম কিভাবে বিকৃত তা যদি মানুষের মাঝে প্রচার করা যায়, তবে আমাদের দেশ থেকে ধর্মীয় অন্ধত্ব, গোঁড়ামী, জঙ্গিবাদ, ধর্মীয় সন্ত্রাস, ধর্মব্যবসা এক কথায় ধর্মের নামে যা কিছু মিথ্যা সমাজে প্রতিষ্ঠিত আছে তা একেবারে নির্মূল হয়ে যাবে। কোনো গোষ্ঠী আর ধর্মের নামে হুজুগ সৃষ্টি করে সাধারণ মানুষের জানমালের ক্ষতি সাধন করতে পারবে না। পাশাপাশি প্রকৃত ধর্মের রূপ কেমন ছিল, নবী-রসুল-অবতারদের মূল শিক্ষা কী ছিল, তাঁরা সারা জীবন কিসের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন, মানবজাতির প্রকৃত ইবাদত কী ইত্যাদি বিষয়গুলো মানুষের সামনে পরিষ্কার করে তুলে ধরতে হবে। তবেই মানুষ সজাগ ও সচেতন হবে, তাদের ধর্মবিশ্বাসকে আর কেউ চুরি করতে পারবে না।
অপরাজনীতি: রাজনীতি হলো রাজ্য পরিচালনার নীতি। রাজনীতির উদ্দেশ্য সাধারণ কল্যাণ, সামাজিক শুভবোধ ও নৈতিক পূর্ণতা সাধন তাই যারা রাজনীতি করবে তাদের একমাত্র লক্ষ্য হবে মানুষের কল্যাণ, সমাজে ন্যায়, সুবিচার ও শান্তি প্রতিষ্ঠা, দেশ ও জাতির সার্বিক উন্নয়ন সাধন করা। এ কাজের জন্য রাজনীতিকদের অবশ্যই নিঃস্বার্থ হতে হবে, তাদেরকে অবশ্যই ব্যক্তিস্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠতে হবে। কিন্তু বর্তমানে রাজনীতি সর্বাধিক লাভজনক পেশা হিসাবে স্বীকৃত হয়ে গেছে। ভোটের সময় আসলেই রাজনীতিকগণ দেশপ্রেম, দেশ ও জনগণের সেবা, দেশের উন্নয়ন ইত্যাদি আপ্তবাক্যে মাইক্রোফোন সিক্ত করেন কিন্তু নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তাদের অধিকাংশের ব্যস্ত সময় কাটে নিজের পকেট ভারী করতে, নিজের নানামুখী স্বার্থ ও নিজ দলের স্বার্থ উদ্ধার করতে। আবার পাঁচ বছর পর নতুন প্রলোভন নিয়ে জনগণের সামনে ভোটভিক্ষা করতে উপস্থিত হয় তারা। প্রচলিত সিস্টেমে যেহেতু নির্বাচনের সময় ব্যালটে সিল প্রদানের দ্বারা প্রতিবাদের মাধ্যমে অন্য কোনো স্বার্থবাজ লোককে নির্বাচিত করা ছাড়া সাধারণ মানুষের আর কোনো উপায় থাকে না তাই নতুন কোনো স্বার্থবাজ নেতা পায় জনগণের সমর্থন আর নতুন উদ্যমে চলতে থাকে নবনির্বাচিত প্রতিনিধির স্বার্থ উদ্ধারের পালা। জনগণের রক্তঝরানো টাকা নেতা-নেত্রীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমতে থাকে নানা প্রক্রিয়ায়। সেই অর্থের ন্যূনতম লভ্যাংশও যেন জনগণের ভাগ্যে না জোটে সে জন্য সেই অর্থ আবার বিদেশি ব্যাংকে পাচার হয়ে যায়। দেশ ও জাতি সঙ্কটে পড়লে জনগণকে ছেড়ে তারা যেন উড়াল দিয়ে প্রভুদের দেশে বসবাস করতে পারে সে ব্যবস্থাও পাকাপোক্ত করা থাকে। দেশের মানুষ বন্যায় ডুবে মরে আর তারা সাহায্যের অজুহাতে ত্রাণ তহবিল থেকে অর্থলুট করে। এভাবে প্রতিটা ক্ষেত্রে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের চেষ্টা চলে, এদিকে দেশ ও জনগণের স্বার্থ উপেক্ষিতই থেকে যায়। আমরা প্রতিদিন চোখের সামনে দুর্নীতির খবর দেখি, দেখি রাজনীতিকদের দেশ বিক্রির প্রতিযোগিতা তবুও আমরা নিশ্চুপ, নিশ্চল দর্শক হয়েই বসে থাকি। এটাকেই আমরা ভাগ্য বলে মেনে নিয়েছি।
আমরা মনে করি, এই রাজনীতি মূলত অপরাজনীতি যা দেশের স্বার্থে এই মুহূর্তে বন্ধ হওয়া উচিত। রাজনীতি মানেই মিথ্যা, রাজনীতিক কর্মসূচি মানেই সংঘাত, সংঘর্ষ, জ্বালাও-পোড়াও, ভাংচুর ইত্যাদি যা কেবল ধ্বংসই ডেকে আনে। আত্মপ্রচার ও কুৎসা রটনা করা, বিরোধী দলে থাকলে সরকারের সব কাজের বিরোধিতা করা আর সরকারি দলে থাকলে বিরোধী দলের নেতা-কর্মীদেরকে হামলা-মামলা দিয়ে হয়রানি করাই এখন রাজনীতি। এই রীতিগুলোকে রাজনীতি থেকে বিদায় জানাতে হবে। স্বার্থচিন্তা বাদ দিয়ে দেশ ও জনগণের জন্য চিন্তা করতে হবে। রাজনীতিকরা কেবল সেই কাজই করবেন যা জনগণের জন্য কল্যাণকর হয়। রাজনীতি কোনো পেশা নয়, এটি জনসেবা। যারা রাজনীতি করবে তারা জনসেবার মানসিকতা নিয়েই করবে, ঠিক যে কথা তারা পোস্টারে লিখে থাকেন যে “জনসেবার সুযোগ চাই”। তারা নিজের বাড়িতে থাকবেন, নিজের উপার্জিত টাকায় সংসার চালাবেন, নিজের গাড়ি থাকলে নিজের টাকায় তেল কিনবেন, গাড়ি না থাকলে পাবলিক বাহনে চলবেন, নিজের ফোনবিল নিজে দিবেন। একটি টাকাও জাতির কাছ থেকে তথা সরকারের কাছ থেকে নেবেন না। যারা রাজনীতি করেন এটুকু সামর্থ্য তাদের প্রত্যেকেরই আছে। এই রাজনীতি মানুষকে শান্তি দেবে, এই রাজনীতি যারা করবেন তারা পরকালেও আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম প্রতিদান পাবেন। রাজনীতির দ্বারা অর্থাগমের কোনো সুযোগ থাকলে তা পুনরায় কালক্রমে বর্তমানের ন্যায় অপরাজনীতির জন্ম দেবে। ব্যবসায়ীরা যদি সৎভাবে ব্যবসা করেন ইসলামের দৃষ্টিতে সেটা এবাদত, একইভাবে রাজনীতিও সৎভাবে করা হলে এবাদতে পর্যবসিত হবে। তারা মানুষের সেবা করার মধ্যেই জীবনের স্বার্থকতা খুঁজে পাবেন, ভোগের পরিবর্তে তারা ত্যাগেই পরিতৃপ্ত হবেন। তাদের কাছে অর্থ-সম্পত্তির চেয়ে মানুষের ভালোবাসা, দোয়া অধিক কাম্য হবে।
[০১৯৩৩৭৬৭৭২৫, ০১৭৮২১৮৮২৩৭, ০১৬৭০১৭৪৬৪৩]

Photocard
টাইটেল সাইজ
লাইন স্পেস
অ্যাকশন
বামে বা ডানে সোয়াইপ করুন

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ
বর্তমানে উন্নত কি অনুন্নত- সমগ্র পৃথিবীতেই এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর উপর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আধিপত্য বিস্তার করছে, হামলা করছে, দখল করছে; আর রাষ্ট্রগুলোর…
 ২ মে ২০২৬    HT All Article

শ্রমিকের ঘাম নিয়ে ওয়াজ ও রাজনীতি -রিয়াদুল হাসান

শ্রমিকের ঘাম নিয়ে ওয়াজ ও রাজনীতি -রিয়াদুল হাসান
প্রতি বছরের মতো এবারও পালিত হলো আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। কোভিড ১৯, ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি- সব মিলিয়ে একের পর এক সংকটে আমাদের দেশের…
 ২ মে ২০২৬    HT All Article

ইরান যুদ্ধ: বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ -হাসান মাহ্দী

ইরান যুদ্ধ: বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ -হাসান মাহ্দী
ইরান যুদ্ধ: বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ -হাসান মাহ্দী২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় কেঁপে ওঠে তেহরান। হামলার শুরুতেই…
 ২ মে ২০২৬    HT All Article

শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র ইসলামই সক্ষম: ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র ইসলামই সক্ষম: ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম
হেযবুত তওহীদের শীর্ষ নেতা ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেছেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র ইসলামই সক্ষম। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক শ্রমিক সম্মেলনে…
 ১ মে ২০২৬    HT All Article

দুনিয়াকে নরককূণ্ডে পরিণত করা হয়েছে– এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

দুনিয়াকে নরককূণ্ডে পরিণত করা হয়েছে– এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম
দুনিয়াকে নরককূণ্ডে পরিণত করা হয়েছে। সর্বত্র চলছে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, দরিদ্রের উপর ধনীর বঞ্চনা। এই নরককূণ্ড থেকে বাঁচতে হলে মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা বাদ দিয়ে…
 ২৯ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

ফের সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাব: আর কতবার সংশোধন হলে শান্তি ফিরবে পাঞ্জেরি! -কথক দা

ফের সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাব: আর কতবার সংশোধন হলে শান্তি ফিরবে পাঞ্জেরি! -কথক দা
জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বুধবার সংসদের দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেই তিনি এ প্রস্তাব পেশ করেন। ১৭ সদস্য…
 ২৯ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

বিশ্বপরিস্থিতি, আমাদের জাতীয় সংকট এবং মুক্তির একমাত্র পথ -মুস্তাফিজ শিহাব

বিশ্বপরিস্থিতি, আমাদের জাতীয় সংকট এবং মুক্তির একমাত্র পথ -মুস্তাফিজ শিহাব
বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা এক ভয়াবহ অশান্তি ও অস্থিরতার চিত্র দেখতে পাই। দেশে দেশে যুদ্ধ, সংঘাত, রক্তপাত আর ত্রাহি সুরের হাহাকার। বিশেষ করে গত…
 ২৯ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article
পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমিয়েছে চীন

জ্বালানির দাম কমালো চীন জ্বালানির দাম কমালো চীন

জ্বালানির দাম কমালো চীন জ্বালানির দাম কমালো চীন
চীনে প্রতি ১০ কর্মদিবস অন্তর বৈশ্বিক তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করা হয়। নতুন দামে ৫০ লিটার জ্বালানি কিনতে এখন চালকদের প্রায়…
 ২৯ এপ্রিল ২০২৬    মতামত

পন্নী পরিবারের শিকড়: কররানি রাজবংশের গৌরবগাথা

পন্নী পরিবারের শিকড়: কররানি রাজবংশের গৌরবগাথা
রিয়াদুল হাসান গৌড়ের রাজ দরবারে চাচা কুতুব খানের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে সুলতান তাজ খান কররানির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন যুবক ঈসা খাঁ ও ইসমাইল…
 ২৭ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

সোনার মাটিতে ভিনদেশি বিষ: বাণিজ্যচুক্তির আড়ালে দেশি কৃষিকে হত্যার আয়োজন!

সোনার মাটিতে ভিনদেশি বিষ: বাণিজ্যচুক্তির আড়ালে দেশি কৃষিকে হত্যার আয়োজন!
শাহাদৎ হোসেন:বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো এই মাটির কৃষক। কৃষকদের আমরা বলি, সব সাধকের বড় সাধক। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তারা যে ফসল ফলায়,…
 ২৭ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

গুজবের মহামারী; সময় থাকতে মনা হুঁশিয়ার!

গুজবের মহামারী; সময় থাকতে মনা হুঁশিয়ার!
কথক দা: আমরা যেন আইয়্যামে গুজবে বাস করছি। অপতথ্য আর অপসংবাদের ভীড়ে কোনটা সত্য আর কোনটা অর্ধসত্য এবং কোনটা মিথ্যা তা বোঝা খুবই মুশকিল। একসময়…
 ২৭ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

খুররম খান পন্নী: রাজনীতি, কূটনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের সাহসী অবস্থান

খুররম খান পন্নী: রাজনীতি, কূটনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের সাহসী অবস্থান
এম আর হাসান:খুররম খান পন্নী ছিলেন উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসের এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান পর্ব এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- এই তিনটি…
 ২৬ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ফের বৈঠক যুদ্ধ বন্ধের আশা কতটা?

ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ফের বৈঠক যুদ্ধ বন্ধের আশা কতটা?
শাহাদৎ হোসেন:ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ ৪৭ বছরের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। গত ১১ এপ্রিল দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে…
 ২৬ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

ঋণের চাপে ‘ক্লান্ত’ অর্থনীতি সুদের ভর্তুকিতেই যাবে বাজেটের বড় অংশ

ঋণের চাপে ‘ক্লান্ত’ অর্থনীতি সুদের ভর্তুকিতেই যাবে বাজেটের বড় অংশ
ওবায়দুল হক বাদল:আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। এসব খাতে ২ লাখ…
 ২৬ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

মুসলিম বিশ্বের ঐক্য: নিছক আলোচনা নাকি বাস্তবতার দাবি?

মুসলিম বিশ্বের ঐক্য: নিছক আলোচনা নাকি বাস্তবতার দাবি?
মুস্তাফিজ শিহাব:বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে এক চরম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে রয়েছে বিপুল জনশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এবং অন্যদিকে চরম অবমাননা…
 ২৬ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article