জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বুধবার সংসদের দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেই তিনি এ প্রস্তাব পেশ করেন। ১৭ সদস্য বিশিষ্ট কমিটির প্রস্তাব করা হয়েছে; যেখানে সরকারি দল থেকে ১২ জন এবং বিরোধী দল থেকে পাঁচজনকে অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়েছে।
এ ঘটনা আমাদের কাছে নতুন নয়। সংবিধান সংশোধন আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রায় নিয়মিত এক প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। স্বাধীনতার ৫৫ বছরে ইতোমধ্যে ১৭ বার সংবিধান সংশোধন হয়েছে। প্রতিবারই আশা জাগানো হয়েছে, এবার পরিবর্তন আসবে, এবার স্থিতিশীলতা আসবে, এবার জনগণ স্বস্তি পাবে। মানুষ আশায় বুক বেধেছে, স্বপ্ন দেখেছে এবং প্রতিবারই হতাশ হয়েছে।
৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব -এই দীর্ঘ পথচলায় এ দেশের মানুষ স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছে, রক্ত দিয়েছে, জীবন দিয়েছে। ছাত্ররা বুক পেতে দাঁড়িয়েছে, সাধারণ মানুষও রাজপথে তাজা রক্ত ঢেলে দিয়েছে। কিন্তু এত ত্যাগের পরও বাস্তবতা কী বলছে?
মানুষ শান্তির দেখা পায়নি। মানুষ স্বস্তিতে নেই। মানুষের নিরাপত্তাহীনতা কাটেনি। অন্যায়, অত্যাচার, যুলুম, নির্যাতন বন্ধ হয়নি। হত্যা, খুন, ধর্ষণ, দুর্নীতি কমেনি বরং ভয়ংকরভাবে বাড়ছে, বেড়েই চলেছে। সমাজে অস্থিরতা যেন নিত্যদিনের সঙ্গী। হুজুগ আর গুজব এখন মহামারীর রূপ নিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপতথ্য ছড়িয়ে গ্যাং ভায়োলেন্স সৃষ্টি হচ্ছে, প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে পরিকল্পিত হামলার পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে, এবং প্রকাশ্য দিবালোকে মানুষ হত্যা করা হচ্ছে।
রাষ্ট্রব্যবস্থার এই দুর্বলতার সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। বিচারহীনতার সংস্কৃতি যেন অদৃশ্য এক শক্তি হয়ে সমাজকে গ্রাস করছে। গত আড়াই মাসে ৪৬৪টি হত্যা ও ৬৬৬টি ধর্ষণ মামলার এই পরিসংখ্যান কেবল সংখ্যা নয়, বরং রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। অন্যদিকে আদালতে প্রায় ৪৭ লক্ষ মামলা ঝুলে আছে। বছরের পর বছর বিচার না পেয়ে মানুষ হতাশ, ক্ষুব্ধ।
অভ্যূত্থান হচ্ছে, বিপ্লব হচ্ছে, নির্বাচন হচ্ছে; একটার পর একটা সরকার পরিবর্তন হচ্ছে কিন্তু কাক্সিক্ষত শান্তি ও নিরাপত্তা যেন অধরাই থেকে যাচ্ছে। মানুষ স্বপ্ন দেখে, কিন্তু সেই স্বপ্ন বারবার ভেঙে যায়।
সীমাহীন দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর একটি অন্তর্বর্তী সরকার দেশের দায়িত্ব নেয়। নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে সেই সরকার নিয়ে মানুষের মাঝে নতুন আশার সঞ্চার হয়েছিল। কিন্তু সেই আশায়ও গুড়ে বালি। এই সরকারের আমলে মব-সংস্কৃতি বিস্তার লাভ করে, ভিন্নমতাবলম্বীরা আতঙ্কে জীবনযাপন করে, দুই শতাধিক মাজারে হামলার ঘটনা ঘটে এবং বহু মানুষ মব সহিংসতার শিকার হয়ে মৃত্যুবরণ করে। এমনকি সেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টাদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতির অভিযোগ উঠছে এখন।
এই প্রেক্ষাপটে প্রশ্ন জাগে- আর কত আমরা একই চক্রে ঘুরপাক খাবো? আর কত পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলবে ব্রিটিশ খ্রিস্টানদের রেখে যাওয়া এই রাষ্ট্রব্যবস্থা, সিস্টেম নিয়ে? আর কত অধঃপতনের পর আমাদের বোধোদয় হবে? এক্সপেরিমেন্ট করে করে আর কত সর্বনাশ করব জাতির? আর কত রক্ত ঝরলে, আমরা বুঝব যে এই সিস্টেম দিয়ে আর হবে না। আমাদের স্বপ্ন আর কতবার দুঃস্বপ্নে পরিণত হলে, আমাদের প্রত্যাশা আর কত হতাশায় পর্যবসিত হলে আমাদের ঈমান আসবে যে এই ব্যবস্থা আসলেই ব্যর্থ?
বাস্তবতা হলো- আমাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক, বিচার বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, আমলাতন্ত্র ও শিক্ষাব্যবস্থা এখনো ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক কাঠামোর উপর ভিত্তি করে দাঁড়িয়ে আছে। এই কাঠামো তৈরি হয়েছিল আমাদের শোষণ ও নিয়ন্ত্রণের জন্য, জনগণের কল্যাণ ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার জন্য নয়। ৪৭ সালে তারা আমাদের নামমাত্র স্বাধীনতা দিয়ে গেছে বটে কিন্তু তাদের সেই গোলাম তৈরির সিস্টেম রেখে গেছে। আর আমরা এখনো তাদের দেওয়া সিস্টেমের মধ্যে থেকে স্বাধীনতা খুঁজছি, মুক্তি খুঁজছি, শান্তি খুঁজছি।
আমাদের বুঝতে হবে সমস্যা ব্যক্তিতে নয়। সমস্যা সিস্টেমে। এই সিস্টেমে ফেরেশতা এসে রাষ্ট্রের হাল ধরলেও আযাজিল হয়ে নেমে আসতে হবে। কারণ রাস্তাটাই এমন। আপনি যত ভালো চালকই হন না কেন রাস্তা বাঁকা হলে আপনি সোজা গাড়ি চালাতে পারবে না, এক্সিডেন্ট অবশ্যম্ভবি।
“বিদ্যমান এই মানবসৃষ্ট আইন-বিধান আমাদের শান্তি দিতে পারেনি, পারবে না। সংবিধান যত সংস্কর করুন না কেন, যতই সংশোধন করুন না কেন মানুষের তৈরি সিস্টেমে জীবনবিধানে শান্তি আসবে না। প্রয়োজন আমূল পরিবর্তন এবং মানুষকে যিনি সৃষ্টি করেছেন বিশ্বজগতের পরিচালক সেই আল্লাহর দেওয়া সিস্টেম, তওহীদভিত্তিক শাশ্বত জীবনব্যবস্থাই মানুষকে মুক্তি দিতে, ন্যায়-শান্তি-সুবিচার ফিরিয়ে দিতে সক্ষম।
দেশের হাল যারা ধরেছেন, সেই নাবিকদের উদ্দেশে তাই কবি ফররুখ আহমেদের কবিতার ছন্দে ছন্দ মিলিয়ে প্রশ্ন রেখেই শেষ করতে হয় -সংবিধান আর কতবার সংশোধন হলে শান্তি ফিরবে পাঞ্জেরি?
ফের সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাব: আর কতবার সংশোধন হলে শান্তি ফিরবে পাঞ্জেরি! -কথক দা
ফের সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাব: আর কতবার সংশোধন হলে শান্তি ফিরবে পাঞ্জেরি! -কথক দা
বজ্রশক্তি ডেস্ক


