প্রচ্ছদ    HT All Article   ধর্ম রাষ্ট্রের জন্য সংকট নয়,...

ধর্ম রাষ্ট্রের জন্য সংকট নয়, বরং আশীর্বাদ

১ এপ্রিল ২০২৫ ০৮:৫৫ পিএম
বজ্রশক্তি ডেস্ক

ডা. জাকারিয়া হাবিব:
১৫শ ও ১৬শ শতাব্দীতে ইউরোপে রেনেসাঁ হয়েছিল খ্রিষ্টধর্মের গোড়ামি থেকে মানুষের চিন্তাকে মুক্ত করার জন্য। এর কারণ মধ্যযুগের খ্রিষ্টান ধর্মগুরুরা বিজ্ঞানবিরোধী ছিলেন, বিজ্ঞানের নব নব আবিষ্কারকে তারা ধর্মবিরোধী বলে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। বহু বিজ্ঞানী ও যুক্তিশীল মানুষকে তারা নির্মমভাবে হত্যা করেছিলেন। তখন থেকেই ধর্মবিরোধী একটা মনোভাব ইউরোপকে পেয়ে বসেছিল। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার করে ইউরোপ যখন শিল্পবিপ্লব ঘটালো, তখন তারা এত বেশি পরিমাণ পণ্য উৎপাদন করার সক্ষমতা অর্জন করল যে সেই পণ্যের বাজার সৃষ্টি এবং সস্তায় শ্রমিক সংগ্রহের লক্ষ্যে তারা বাকি দুনিয়ায় নিজেদের উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করল। তখন তাদের মাধ্যমে ধর্মবিরোধী সেই মানসিকতাও তাদের উপনিবেশগুলোতে বিস্তার লাভ করল। শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমেও ধর্মবিরোধী, ধর্মহীন একটি শিক্ষিত গোষ্ঠী উপনিবেশগুলোতে সৃষ্টি করা হল যারা মানসিকভাবে পাশ্চাত্য প্রভুদের দাস আর পেশাগতজীবনে উপনিবেশের কেরানি।

এভাবেই গত কয়েকশ বছর ধরে ধর্মবিদ্বেষ আমাদের সমাজে ও মননে ঠাঁই গেড়ে বসেছে। চলমান রাষ্ট্রকাঠামোতে ধর্মের কোনো গুরুত্ব বা কর্তৃত্ব নেই। ধর্ম এখানে কেবল ব্যক্তিগত উপাসনা ও বিশ্বাসের জায়গায় রয়েছে। তবুও রাষ্ট্রনায়কদেরকে সদা-সর্বদা ধর্মীয় উগ্রবাদ, ধর্মভিত্তিক রাজনীতি ইত্যাদি নিয়ে মাথা ঘামাতে হচ্ছে। এমনকি ধর্ম, ধর্মীয় উগ্রবাদ ও ধর্মভিত্তিক বিভাজনই হয়ে দাঁড়িয়েছে গোটা বিশ্বের প্রধান রাজনৈতিক ইস্যু, যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণ। রাষ্ট্র যতই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলুক, রাজনৈতিক দলগুলো ভোটের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠ ধর্মসম্প্রদায়ের মন যুগিয়ে চলতে বাধ্য হয়। ধর্মের উদ্দেশ্যমূলক অপব্যবহারের মাধ্যমেই সৃষ্টি করা হয় ধর্মীয় উন্মাদনা, মবোক্র্যাসি, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা। তাই ধর্ম আমাদের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টর। তাই তো নির্বাচন এলে স্রষ্টার অস্তিত্বে অবিশ্বাসী সমাজতান্ত্রিক দলের নেতারাও হজ করেন, মুসল্লি সাজেন, ধর্মের পক্ষে বুলি আউড়ান। প্রশ্ন হল, ধর্ম এত বাজে, এত সেকেলে, এত অচল, এত আফিম- তবু কেন এত চেষ্টা করেও ধর্মকে মানুষের জীবন থেকে বাদ দেওয়া গেল না? মুক্তবুদ্ধির চর্চার নামে ধর্ম থেকে মুক্তির জন্য কত কিছুই না করা হচ্ছে, অশ্লীলভাবে আল্লাহ-রসুলকে আক্রমণ করা হচ্ছে, তবু কেন ঘুরে ফিরে ধর্মই আমাদের জীবনের প্রধান আলোচিত বিষয় হয়ে রয়ে যাচ্ছে? সুতরাং মানুষকে ধর্মহীন করার যে চেষ্টা করা হয় সেটা কোনোদিন সফল হয় নি, হবেও না। তাই এখন একটাই করণীয়, মানুষের ঈমানকে, ধর্মবিশ্বাসকে সঠিক পথে চালিত করা, এর শক্তিকে মানবকল্যাণে কাজে লাগানো।

যেহেতু অধিকাংশ মানুষ ধর্মবিশ্বাসী, তাদের এই বিশ্বাসকে কেউ যেন ধ্বংসাত্মক মানবতাবিরোধী কাজে ব্যবহার না করতে পারে সেজন্য এই বিশ্বাসকে সঠিক খাতে, মানবতার পক্ষে, গঠনমূলক কাজে লাগাতে হবে। সেটা কীভাবে সম্ভব তা আমরা দেশজুড়ে হাজার হাজার সেমিনার, সভা-সমাবেশের মাধ্যমে, প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করে তুলে ধরেছি, পুস্তিকা ও প্রবন্ধ লিখে সমাজের শিক্ষিত সচেতন মানুষের সামনে তুলে ধরেছি। আমাদের এই প্রস্তাবের মূল ধারণা হচ্ছে, ধর্ম ও রাষ্ট্রকে পৃথক প্রতিষ্ঠান করে রাখা যাবে না, বরং রাষ্ট্রের সঙ্গে ধর্মকে যুক্ত করতে হবে। বর্তমানে ধর্মকে ব্যক্তিগত উপাসনা ও আনুষ্ঠানিকতার জায়গায় ফেলে রাখা হয়েছে। এতে করে ধর্ম জাতি ও রাষ্ট্রের কোনো উপকারে আসতে পারছে না, কেবল ব্যক্তির ধ্যান-ধারণা ও আধ্যাত্মিকতার বিষয় হিসাবে পরিগণিত হচ্ছে। ধর্ম সম্পর্কে, ধর্মের মৌলিক বিষয়গুলো সম্পর্কে প্রচলিত ধ্যান-ধারণার পরিবর্তন ঘটিয়ে সঠিক ধারণা মানুষকে প্রদান করতে হবে। কারণ ইসলামের সকল আলেম-ওলামা ও ফকীহগণ একমত যে- আকিদা ঠিক না থাকলে ঈমানের কোনো মূল্য নেই। আর স্বভাবতই ঈমানের মূল্য না থাকলে ঐ ঈমানভিত্তিক আমলেরও কোনো মূল্য থাকে না। তাই ইসলাম-শিক্ষা বইগুলোর প্রথমেই থাকে ‘আকায়েদ’ অধ্যায়।

আরও পড়ুন

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

সেই মহামূল্যবান আকিদা কী? আকিদা হচ্ছে কোনো বস্তু বা বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা (Comprehensive concept)। কোনো কাজ কী উদ্দেশ্যে করা হবে- সেটা জেনে বুঝে করাই আকিদা। ঘড়ির কাজ সময় দেওয়া, কলমের কাজ লেখা। এটা বোঝাই ঘড়ি ও কলম সম্পর্কে সঠিক আকিদা। এটা জানা না থাকলে সেগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করা যাবে না। একইভাবে আমাদেরকে জানতে হবে কেন আমরা ঈমান পোষণ করব, ধর্ম বলতে কী বোঝায়, ধার্মিক কারা, কোন কাজটি প্রকৃত এবাদত, নবী-রসুলদের আগমনের উদ্দেশ্য কী, নামায-রোযা-হজ্ব ইত্যাদি কেন আল্লাহ করতে বলেছেন। এ বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক ধারণা বিগত ১৩০০ বছর ধরে ক্রমে ক্রমে বিকৃত হয়ে গেছে। তাই মানবজাতির ধর্মবিশ্বাস থাকলেও আকিদা ঠিক নেই, ফলে আমল অর্থাৎ নামাজ, রোজা, হজ্ব, যাকাত, যিকির-আজকার ইত্যাদি নিষ্ফল হচ্ছে। এ অবস্থা বোঝাতেই আল্লাহর রসুল ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, এমন সময় আসবে যখন মানুষের রোজা হবে না খেয়ে থাকা (উপবাস), তাহাজ্জুদ হবে ঘুম নষ্ট করা (কবুল হবে না)। তাই ধর্মের মূল বিষয়গুলো সম্পর্কে সঠিক আকিদা বা সামগ্রিক ধারণা মানুষের সামনে সর্ব উপায়ে তুলে ধরতে হবে। তাহলেই মানুষের ধর্মবিশ্বাস গঠনমূলক খাতে প্রবাহিত হবে।

ধর্ম কী? ধার্মিক কারা?
ধর্ম শব্দের অর্থ ধারণ করা। কোনো বস্তু, প্রাণী বা শক্তি যে বৈশিষ্ট্য বা গুণ ধারণ করে সেটাই হচ্ছে তার ধর্ম। আগুনের ধর্ম পোড়ানো। পোড়ানোর ক্ষমতা হারালে সে তার ধর্ম হারালো। মানুষের ধর্ম কী? মানুষের ধর্ম হচ্ছে মানবতা। অর্থাৎ যে ধর্মবিশ্বাসী ব্যক্তি অন্যের দুঃখ-কষ্ট হৃদয়ে অনুভব করে এবং সেটা দূর করার জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালায় সে-ই ধার্মিক। অথচ প্রচলিত ধারণা হচ্ছে যে ব্যক্তি নির্দিষ্ট লেবাস ধারণ করে সুরা কালাম, শাস্ত্র মুখস্থ বলতে পারে, নামায-রোযা, পূজা, প্রার্থনা করে সে-ই ধার্মিক।

মানবজাতির প্রকৃত এবাদত কী?
আল্লাহর এবাদত করার জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে (সুরা যারিয়াত ৫১:৫৬)। এবাদত হচ্ছে যাকে যে কাজের জন্য সৃষ্টি করা হয়েছে সেই কাজটি করা। চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, পশু-পাখি, তরুলতা আল্লাহ যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন সেগুলো তারা অহর্নিশি করে যাচ্ছে, অর্থাৎ তারা তাদের এবাদত করছে। আল্লাহ মানুষ সৃষ্টি করেছেন তাঁর প্রতিনিধি (Representative) হিসাবে (সুরা বাকারা ২:৩০)। অর্থাৎ সমগ্র সৃষ্টিকে আল্লাহ যেভাবে সুশৃঙ্খল, শান্তিপূর্ণ রেখেছেন ঠিক সেভাবে এ পৃথিবীকে শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল রাখাই মানুষের এবাদত। ধরুন আপনি গভীর রাত্রে প্রার্থনায় মগ্ন। হঠাৎ পাশের বাড়ি থেকে ‘আগুন আগুন’ বলে আর্তচিৎকার ভেসে এল। আপনি কী করবেন? দৌড়ে যাবেন সাহায্য করতে নাকি চোখ-কান বন্ধ করে প্রার্থনা চালিয়ে যাবেন। যদি আগুন নেভাতে যান সেটাই হবে আপনার এবাদত। আর যদি ভাবেন- বিপন্ন ব্যক্তি অন্য ধর্মের লোক, অথবা আল্লাহর উপাসনা ফেলে আগুন নেভাতে যাওয়া দুনিয়াবি কাজ, তাহলে আপনার মধ্যে মানুষের ধর্ম নেই, আপনার নামায-রোযা, প্রার্থনা সবই পণ্ডশ্রম। একটি উদাহরণ দিয়ে কথাটি পরিষ্কার করছি।

আল্লাহ মুসা (আ.) কে বলছেন, ‘আমিই আল্লাহ, আমি ব্যতীত কোনো এলাহ (হুকুমদাতা) নেই, অতএব আমার ‘এবাদত’ কর এবং আমার স্মরণার্থে সালাহ কায়েম কর (সুরা ত্বা-হা ২০:১৪)। এমনই আরো অনেক আয়াত থেকে সুস্পষ্ট হয়ে যায় যে এবাদত ও সালাহ আলাদা বিষয়। প্রকৃতপক্ষে এবাদত হচ্ছে আল্লাহ কর্তৃক অর্পিত দায়িত্ব। মুসার (আ.) দায়িত্ব অর্থাৎ এবাদত কী ছিল তা আল্লাহ তাঁকে জানিয়ে দিলেন। বললেন, ‘ফেরাউনের নিকট যাও, সে দারুণ উদ্ধত হয়ে গেছে (সুরা ত্বা-হা ২০:২৪)। আল্লাহ তাঁকে ফেরাউনের কাছে পাঠালেন অত্যাচারিত, নির্যাতিত, নিষ্পেষিত ইহুদি জাতিকে দাসত্বের কবল থেকে মুক্ত করে তাদের মানবাধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য, মানবতা প্রতিষ্ঠা করার জন্য।

সমাজের যারা আল্লাহওয়ালা লোক হিসাবে পরিচিত তারা সমাজকে অপশক্তির হাতে ছেড়ে দিয়ে ব্যক্তিগত নাজাতের চিন্তায় মশগুল, আর ধর্মব্যবসায়ীরা ব্যস্ত স্বার্থসন্ধানে। যে ধর্মীয় অনুষ্ঠানগুলো পালন করলে তাদের রোজগার ও ভোজনবিলাসের সম্ভাবনা থাকে সেগুলোকেই তারা জোর দেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে দান করার জন্য দানবাক্স-মাইক নিয়ে তাদেরকে ওয়াজ করতে দেখা যায়, কিন্তু ব্রিজ, কালভার্ট, রাস্তাঘাট, হাসপাতাল বা নিরাশ্রয়ের জন্য বাসগৃহ নির্মাণ অর্থাৎ কোনো প্রকার জাতীয় উন্নয়নের কাজে বা জনকল্যাণমূলক কাজে দান করাও যে এবাদত এটা তাদের আকিদার মধ্যে, চিন্তার মধ্যেও নেই। এবাদতের সঠিক অর্থ না বোঝার কারণে নির্যাতিতের হাহাকার, ক্ষুধার্তের ক্রন্দন মহা ধার্মিকদের কানে প্রবেশ করে না। এগুলোকে দুনিয়াবি কাজ বলে এড়িয়ে যাবার মত পাশবিক মনোবৃত্তি তাদের তৈরি হয়েছে।

মুসার (আ.) জন্য এবাদত ছিল দীর্ঘদিন ধরে ফেরাউনের দাসত্বের কবলে নিষ্পেষিত ইহুদি জাতিকে মুক্ত করা। প্রকৃতপক্ষে নিপীড়িত জনতাকে জালেম ও অন্যায় ব্যবস্থার হাত থেকে মুক্ত করে শান্তি দেওয়াই হচ্ছে মানুষের মূল এবাদত, এটাই হচ্ছে আল্লাহর খলিফা, প্রতিনিধি হিসাবে মানুষের কাজ। শেষ রসুল মোহাম্মদ (সা.) এর রহমাতাল্লিল আলামিন নামের অর্থই হচ্ছে সমস্ত জগতের জন্য করুণা, রহমত। সুতরাং উম্মতে মোহাম্মদীরও সেটা হওয়াই বাঞ্ছনীয়। যে বেলাল (রা.) একদিন কোরায়েশদের নিপীড়িত ক্রীতদাস ছিল সেই বেলালকে (রা.) রসুলাল্লাহ ক্বাবার উপরে উঠে আযান দিতে আদেশ করেছিলেন। এর মাধ্যমে তিনি জগদ্বাসীকে বুঝিয়ে দিলেন ইসলামের দৃষ্টিতে সবকিছুর চাইতে মানবতা ঊর্ধ্বে, মানুষ ঊর্ধ্বে। তোমরা যে পাথরের ঘরের পানে ফিরে সেজদা করছ আল্লাহকে পাওয়ার জন্য, মো’মেনের মর্যাদা সেই ক্বাবারও উপরে। অর্থাৎ সমস্ত কিছুর ঊর্ধ্বে মানবতা।

আজকে সেই মানুষ নির্যাতিত, নিগৃহীত, সর্ব-অধিকার বঞ্চিত। সেই মজলুম মানুষকে জালেমের অত্যাচারের মধ্যে রেখে ধার্মিকরা মন্দির মসজিদ গির্জা প্যাগোডা বানাচ্ছেন। এই অন্তর্মুখিতা আর সমাজের অন্যায়ের বিরুদ্ধে নির্বিকার নিষ্পৃহতা দেখেই কার্ল মার্কস ধর্মকে আফিম বলে আখ্যায়িত করেছিলেন। এই ধর্মকে আফিম বলবেন না তো কী বলবেন? তিনি তো ইসলামের বা কোনো ধর্মেরই প্রকৃত রূপ দেখেন নি। আজকে যেটা ইসলাম হিসাবে চলছে সেটা প্রকৃত ইসলাম নয়, প্রকৃত ইসলাম হারিয়ে গেছে ১৩০০ বছর আগেই। 

নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী যথেষ্ট নয়:
বস্তুবাদী, ভোগবাদী জীবনব্যবস্থার (System) প্রভাবে মানুষ আজ এতটাই স্বার্থপর আত্মকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে যে, নিজের লাভ-ক্ষতি ছাড়া কিছুই ভাবার সময় তার নেই। ফলে চোখের সামনে কোনো অপরাধ হতে দেখলেও মনে করে এর প্রতিবাদ করা তার দায়িত্ব নয়, এ দায়িত্ব শুধুই আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর। কিন্তু সত্য হলো- সমগ্র জাতি যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার না হয়, ন্যায়ের পক্ষে না দাঁড়ায়, সমাজে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করাকে নিজেদের দায়িত্ব কর্তব্য বলে মনে না করে তাহলে শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একার পক্ষে শত চেষ্টা করেও সমাজকে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রদান করা সম্ভব নয়। এজন্য মানুষের মানসিক পরিবর্তন সাধন করতেই হবে। জাতির চরিত্রের উন্নয়নই হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে জাতীয় উন্নয়ন।

স্বার্থপরের নামাজ নাই, সমাজ নাই, জান্নাত নাই:
আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর ব্যক্তি কখনও মো’মেন-মুসলিম হতে পারে না। কারণ পবিত্র কোর’আনের সুরা হুজরাতের ১৫ নম্বর আয়াতে মু’মিন হবার শর্ত হিসেবে জীবন-সম্পদ আল্লাহর রাস্তায় অর্থাৎ মানবতার কল্যাণে উৎসর্গ করে দিয়ে সর্বাত্মক প্রচেষ্টার কথা বলা হয়েছে। সুতরাং সমাজ তথা মানবজাতির শান্তির লক্ষ্যে নিজেদের জীবন-সম্পদ উৎসর্গ করে প্রচেষ্টা না করলে কারও কোনো আমলই কবুল হবে না, তারা জান্নাতেও যেতে পারবে না। অন্যদিকে সমাজ হলো একদল মানুষের সমন্বয়ে গঠিত একটি ব্যবস্থা যার অস্তিত্বের ভিত্তি হলো ঐক্য, শৃঙ্খলা, আনুগত্য, পারস্পরিক সহযোগিতা, ত্যাগ, কোরবানি। এই গুণগুলো মানুষের মধ্য থেকে হারিয়ে গেলে সেটাকে আর মানবসমাজ বলা যায় না, তখনই মানুষের হাত থেকে বাঁচার জন্য মানুষকে সর্বক্ষণ সতর্ক থাকতে হয়। যে ব্যক্তি শুধু নিজের এবং নিজের পরিবারের চিন্তায় মগ্ন থাকে, দেশ-সমাজে যা হয় হোক, তার দিকে ভ্রুক্ষেপও করে না, এমন স্বার্থপরের অধিকার থাকে না কোনো সমাজে বসবাস করার। মানুষকে বুঝতে হবে যে, সে আর দশটা প্রাণীর মতো সাধারণ সৃষ্টি নয়, সে আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি। তার শ্রেষ্ঠত্বের কারণ- সে আল্লাহর রূহ ধারণকারী, আল্লাহর প্রতিনিধি, তাকে আল্লাহ নিজ হাতে বানিয়েছেন এবং অন্য সকল সৃষ্টিকে তার সেবায় নিযুক্ত করেছেন। এই জন্য যে, প্রতিটি প্রাণী কেবল নিজের জন্য বাঁচে কিন্তু মানুষ বাঁচবে অন্যের জন্য। মানুষও যদি কেবল পশুর মতো খায়, বংশবিস্তার করে আর মরে যায় তাহলে তার মানবজীবন ব্যর্থ হয়ে গেল। তাই আমাদের জীবন তখনই সার্থক হবে যখন আমাদের দ্বারা মানবজাতির কোনো কল্যাণ হবে। সেটার পুরস্কার আমরা হাশরের দিনে পাব। আজ সমস্ত বিশ্ব যখন অন্যায় অশান্তি, যুদ্ধ, রক্তপাতে পূর্ণ তখন আমাদের সমাজ তথা প্রিয় জন্মভূমিকে যাবতীয় সন্ত্রাস, হানাহানি থেকে নিরাপদ রাখা আমাদের প্রত্যেকের অবশ্য কর্তব্য, এটা ইসলামের পবিত্র আমল জেহাদের অন্তর্ভুক্ত।

ধর্ম ও ধর্মীয় কর্তব্যকে যখন এই আঙ্গিকে জাতির সামনে তুলে ধরা হবে তখন কোনো উগ্রবাদী গোষ্ঠী আর মানুষের ধর্মবিশ্বাসকে হাইজ্যাক করে মানবতাবিরোধী কাজে, সন্ত্রাস সৃষ্টির কাজে ব্যবহার করতে পারবে না। বরং মানুষ ধর্মীয় কর্তব্য মনে করে সমাজ ও রাষ্ট্রের কল্যাণে কাজ করবে, সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে অতন্দ্র প্রহরীর ন্যায় সদা সতর্ক থাকবে।

[লেখক: চিকিৎসক ও কলামিস্ট; ইমেইল: zakariahabib@gmail.com, ফোন: ০১৭১১০০৫০২৫, ০১৭১১৫৭১৫৮১, ০১৭১১২৩০৯৭৫]

Photocard
টাইটেল সাইজ
লাইন স্পেস
অ্যাকশন
বামে বা ডানে সোয়াইপ করুন

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ

মানবাধিকার ও বাক-স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার পথনকশা -ডা. মাহবুব আলম মাহফুজ
বর্তমানে উন্নত কি অনুন্নত- সমগ্র পৃথিবীতেই এক চরম অস্থিরতা বিরাজ করছে। দুর্বল রাষ্ট্রগুলোর উপর শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো আধিপত্য বিস্তার করছে, হামলা করছে, দখল করছে; আর রাষ্ট্রগুলোর…
 ২ মে ২০২৬    HT All Article

শ্রমিকের ঘাম নিয়ে ওয়াজ ও রাজনীতি -রিয়াদুল হাসান

শ্রমিকের ঘাম নিয়ে ওয়াজ ও রাজনীতি -রিয়াদুল হাসান
প্রতি বছরের মতো এবারও পালিত হলো আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস। কোভিড ১৯, ইউক্রেন রাশিয়া যুদ্ধ, আমেরিকা-ইরান যুদ্ধ, মুদ্রাস্ফীতি- সব মিলিয়ে একের পর এক সংকটে আমাদের দেশের…
 ২ মে ২০২৬    HT All Article

ইরান যুদ্ধ: বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ -হাসান মাহ্দী

ইরান যুদ্ধ: বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ -হাসান মাহ্দী
ইরান যুদ্ধ: বিশ্ব অর্থনীতি ও ভূ-রাজনীতির নতুন সমীকরণ -হাসান মাহ্দী২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। ইসরায়েল ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ বিমান হামলায় কেঁপে ওঠে তেহরান। হামলার শুরুতেই…
 ২ মে ২০২৬    HT All Article

শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র ইসলামই সক্ষম: ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র ইসলামই সক্ষম: ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম
হেযবুত তওহীদের শীর্ষ নেতা ইমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম বলেছেন, শ্রমিকের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে একমাত্র ইসলামই সক্ষম। আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত এক শ্রমিক সম্মেলনে…
 ১ মে ২০২৬    HT All Article

দুনিয়াকে নরককূণ্ডে পরিণত করা হয়েছে– এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম

দুনিয়াকে নরককূণ্ডে পরিণত করা হয়েছে– এমাম হোসাইন মোহাম্মদ সেলিম
দুনিয়াকে নরককূণ্ডে পরিণত করা হয়েছে। সর্বত্র চলছে দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচার, দরিদ্রের উপর ধনীর বঞ্চনা। এই নরককূণ্ড থেকে বাঁচতে হলে মানুষের তৈরি জীবনব্যবস্থা বাদ দিয়ে…
 ২৯ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

ফের সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাব: আর কতবার সংশোধন হলে শান্তি ফিরবে পাঞ্জেরি! -কথক দা

ফের সংবিধান সংশোধনে কমিটি গঠনের প্রস্তাব: আর কতবার সংশোধন হলে শান্তি ফিরবে পাঞ্জেরি! -কথক দা
জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনে বিশেষ কমিটি গঠনের প্রস্তাব উত্থাপন করেছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। বুধবার সংসদের দ্বিতীয় সেশনের শুরুতেই তিনি এ প্রস্তাব পেশ করেন। ১৭ সদস্য…
 ২৯ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

বিশ্বপরিস্থিতি, আমাদের জাতীয় সংকট এবং মুক্তির একমাত্র পথ -মুস্তাফিজ শিহাব

বিশ্বপরিস্থিতি, আমাদের জাতীয় সংকট এবং মুক্তির একমাত্র পথ -মুস্তাফিজ শিহাব
বর্তমান বিশ্বের দিকে তাকালে আমরা এক ভয়াবহ অশান্তি ও অস্থিরতার চিত্র দেখতে পাই। দেশে দেশে যুদ্ধ, সংঘাত, রক্তপাত আর ত্রাহি সুরের হাহাকার। বিশেষ করে গত…
 ২৯ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article
পেট্রোল ও ডিজেলের দাম কমিয়েছে চীন

জ্বালানির দাম কমালো চীন জ্বালানির দাম কমালো চীন

জ্বালানির দাম কমালো চীন জ্বালানির দাম কমালো চীন
চীনে প্রতি ১০ কর্মদিবস অন্তর বৈশ্বিক তেলের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে জ্বালানির মূল্য নির্ধারণ করা হয়। নতুন দামে ৫০ লিটার জ্বালানি কিনতে এখন চালকদের প্রায়…
 ২৯ এপ্রিল ২০২৬    মতামত

পন্নী পরিবারের শিকড়: কররানি রাজবংশের গৌরবগাথা

পন্নী পরিবারের শিকড়: কররানি রাজবংশের গৌরবগাথা
রিয়াদুল হাসান গৌড়ের রাজ দরবারে চাচা কুতুব খানের মধ্যস্থতায় দীর্ঘ দাসত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে সুলতান তাজ খান কররানির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন যুবক ঈসা খাঁ ও ইসমাইল…
 ২৭ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

সোনার মাটিতে ভিনদেশি বিষ: বাণিজ্যচুক্তির আড়ালে দেশি কৃষিকে হত্যার আয়োজন!

সোনার মাটিতে ভিনদেশি বিষ: বাণিজ্যচুক্তির আড়ালে দেশি কৃষিকে হত্যার আয়োজন!
শাহাদৎ হোসেন:বাংলাদেশ কৃষিপ্রধান দেশ। আমাদের অর্থনীতির প্রাণভোমরা হলো এই মাটির কৃষক। কৃষকদের আমরা বলি, সব সাধকের বড় সাধক। রোদ-বৃষ্টি মাথায় নিয়ে তারা যে ফসল ফলায়,…
 ২৭ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

গুজবের মহামারী; সময় থাকতে মনা হুঁশিয়ার!

গুজবের মহামারী; সময় থাকতে মনা হুঁশিয়ার!
কথক দা: আমরা যেন আইয়্যামে গুজবে বাস করছি। অপতথ্য আর অপসংবাদের ভীড়ে কোনটা সত্য আর কোনটা অর্ধসত্য এবং কোনটা মিথ্যা তা বোঝা খুবই মুশকিল। একসময়…
 ২৭ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

খুররম খান পন্নী: রাজনীতি, কূটনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের সাহসী অবস্থান

খুররম খান পন্নী: রাজনীতি, কূটনীতি ও মুক্তিযুদ্ধের সাহসী অবস্থান
এম আর হাসান:খুররম খান পন্নী ছিলেন উপমহাদেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইতিহাসের এক বহুমাত্রিক ব্যক্তিত্ব। তাঁর জীবন ব্রিটিশ শাসন, পাকিস্তান পর্ব এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ- এই তিনটি…
 ২৬ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ফের বৈঠক যুদ্ধ বন্ধের আশা কতটা?

ইসলামাবাদে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র ফের বৈঠক যুদ্ধ বন্ধের আশা কতটা?
শাহাদৎ হোসেন:ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ ৪৭ বছরের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে। গত ১১ এপ্রিল দুই দেশের প্রতিনিধিদের মধ্যে যে…
 ২৬ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

ঋণের চাপে ‘ক্লান্ত’ অর্থনীতি সুদের ভর্তুকিতেই যাবে বাজেটের বড় অংশ

ঋণের চাপে ‘ক্লান্ত’ অর্থনীতি সুদের ভর্তুকিতেই যাবে বাজেটের বড় অংশ
ওবায়দুল হক বাদল:আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে সুদ পরিশোধ, ভর্তুকি, প্রণোদনা ও নগদ ঋণ খাতে বড় অঙ্কের ব্যয় নির্ধারণ করতে যাচ্ছে সরকার। এসব খাতে ২ লাখ…
 ২৬ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article

মুসলিম বিশ্বের ঐক্য: নিছক আলোচনা নাকি বাস্তবতার দাবি?

মুসলিম বিশ্বের ঐক্য: নিছক আলোচনা নাকি বাস্তবতার দাবি?
মুস্তাফিজ শিহাব:বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের দিকে তাকালে এক চরম বৈপরীত্য চোখে পড়ে। একদিকে রয়েছে বিপুল জনশক্তি ও প্রাকৃতিক সম্পদের প্রাচুর্য এবং অন্যদিকে চরম অবমাননা…
 ২৬ এপ্রিল ২০২৬    HT All Article